দালাল দৌরাত্ম্যে সরকারি হাসপাতাল; ভোগান্তিতে নি¤œ আয়ের মানুষ

0
8

বজ্রশক্তি রিপোর্ট:
প্রথম বাবা হলেন জামিউল হক। বাসে বাসে হকারি করে টানাটানির মধ্যে চলে তার সংসার। খেয়ে না খেয়ে কয়েক হাজার টাকা জমিয়েছেন স্ত্রীর ডেলিভারির জন্য। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল থেকে দালালের খপ্পরে পড়ে স্ত্রীকে নিয়ে জান পান্থপথের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। কিন্তু ডেলিভারির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া বিরাট অংকের বিল পরিশোধ করতে না পারায় নবজাতকের মুখটিও দেখতে পারেন নি তিনি। শুধু জামিউল হক নয়। প্রতিদিন সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা খেটে খাওয়া মানুষের এমন হাজারো ভোগান্তির ঘটনা ঘটে চলেছে। এমন অবস্থা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা হলেও দালালচক্র ও হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজোসে গড়ে তোলা এসব সিন্ডিকেট ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ফলে এসব অভিযান বিশেষ কোনা কাজে আসে না। কয়েকদিন না যেতেই আবার সাবেক অবস্থার সৃষ্টি হয়।
রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পুঙ্গ হাসপাতাল, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, কিডনি হাসপাতাল, মিডফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল নিউরোসাইন্স হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ প্রায় সব সরকারি হাসপাতালের চিত্রই এক। ওসব হাসপাতালে দালালদের টাকা দিলে সেবা মেলে, না দিলে ভোগান্তির শেষ নেই। এছাড়া বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালের দালালদের খপ্পরে জামিউল হকের মতো অসংখ্য রোগীকে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
গত এক বছরে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে দেড় শতাধিক দালালকে গ্রেফতার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর তারা আইনি ফাঁকফোকরে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো তৎপরতা শুরু করে। তবে দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করে ওসব হাসপাতালের
কর্তৃপক্ষের দাবি, দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
নিয়ম অনুসরারে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ ব্যয় সরকার বহন করে। সরকারি হাসপাতালে ৭০ শতাংশ বেড বিনামূল্যের এবং ৩০ শতাংশ বেডের জন্য সামান্য ভাড়া নির্ধারিত রয়েছে। তাছাড়া রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রোগীকে স্বল্প পরিমাণ ইউজার ফি বহন করতে হয়। ভাড়ায় বেডে থেকে এবং ইউজার ফি প্রদানের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিলেও কোনো রোগীর মোট খরচের ১৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়। সরকারি হাসপাতালে একজন রোগীর আউটডোরে চিকিৎসা নিতে খরচ হয় ১০ টাকা আর ভর্তি হতে ১৫ টাকা। ভর্তির পর থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার সব ব্যয় সরকারই বহন করে থাকে। তাহলে প্রশ্ন ওঠায় স্বাভাবিক, এত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের কেন দালালের খপ্পরে পড়তে হচ্ছে? বেশকিছু রোগির সাথে কথা বলে জানা যায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিকভাবে সেবা না মেলায় দালালদের দ্বারস্থ হতে হয় রোগীদের। আর হাসপাতালে রোগী প্রবেশের পর থেকেই দালালদের অপতৎপরতা শুরু হয়। বহির্বিভাগ থেকে টিকিট কাটা, টেস্ট বাণিজ্য থেকে শুরু করে বেড পাওয়া সব ক্ষেত্রেই দালালদের দৌরাত্ম্য।
সরকারি হাসপাতালে একটি বেড রোগীদের কাছে অনেক মূল্যবান। কারণ বেড পেতে রোগীদের ধরনা দিতে হয় নানাজনের কাছে। দালালচক্রের সাথে হাত না মেলালে বেড পাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া দালালরা শুধু রোগী নিয়েই ব্যবসা করে না। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনের মোবাইল, টাকা ও মালামালসহ সর্বস্ব সুকৌশলে চুরি করে নেয়। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে কিছু ওষুধ, বেড ও অপারেশন বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও সবকিছুতেই দালালদের দ্বারস্থ হতে হয়। যে কারণে অনেক টাকা খরচ করতে হয় রোগীদের। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়ে গরিব মানুষ। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে তারা ভর্তি হওয়ার পর নিরুপায় হয়ে সহায় সম্বল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। মূলত রাজধানীতে অবস্থিত সরকারি হাসপাতালগুলোতে সক্রিয় সহ¯্রাধিক দালাল চিকিৎসার জন্য গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে। দালালদের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সুসম্পর্ক রয়েছে। আর তাদের সহযোগিতা নিয়েই প্রভাবশালীরা বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিচালনা করেন।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সরকারি হাসপাতাল পরিচালকদের সতর্ক করে বলেন, রোগীর যথাযথ সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতালে দালালদের অনুপ্রবেশ রোধে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে। কোনোভাবেই যেন তারা হাসপাতালে ভিড়তে না পারে।

LEAVE A REPLY