হিলি স্থলবন্দর দিয়ে চার বছর ধরে কাঁচাফল আমদানি বন্ধ

0
3

হিলি প্রতিনিধি, দিনাজপুর:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বেঁধে দেওয়া শুল্কায়ন নির্ধারণের নিয়ম কানুনের ধু¤্রজালে আটকা পড়ে চার বছর ধরে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচাফল আমদানি বন্ধ রয়েছে।
আরো কয়েকটি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে  ট্রাকের চাকা অনুযায়ী পরিমাণ হিসাব করে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এ নিয়মের আওতায় পণ্যবাহী ট্রাকের চাকার সংখ্যাভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ হিসাব করে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়।
শুকনো মরিচ, হলুদ, আদা, রসুন, হিমায়িতমাছ, শুঁটকি মাছ, টমেটো ও পান আমদানির ক্ষেত্রেও গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্ক আহরণের পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। লোকসানের ভয়ে এসব পণ্যের আমদানিও বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা।
এক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ কম থাকলেও নির্দিষ্ট স্ল্যাব অনুযায়ী শুল্কায়ন করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে আমদানিকারকদের। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ফলসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানি বন্ধ রেখেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ স্থলবন্দরে ফল আমদানিতে শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তাদের একটি প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি সোনা মসজিদ ও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ফল আমদানিতে গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্কায়নের নির্দেশ দেয় এনবিআর। হিলি স্থলবন্দরে নিয়মটি এখনো চালু রয়েছে। অথচ শুল্ক ফাঁকির ঘটনাটি সোনা মসজিদের হলেও পরবর্তীতে এ স্থলবন্দরের ক্ষেত্রে জারিকৃত নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ২০১৬ সালে ফের দেশের সব স্থলবন্দরে গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণের নির্দেশনা দেয় এনবিআর।
ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ২০১৩ সাল থেকেই হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ফল আমদানি বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। ওই বছর চালু হওয়া নিয়মে ছয় চাকার গাড়িতে ১৪ টন, ১০ চাকার গাড়িতে ১৮ টন ও ১২ চাকার গাড়িতে ২০ টন পণ্য হিসাব করে শুল্কায়নের নির্দেশ দেয় এনবিআর।
সাম্প্রতিক সময়ে চাকা অনুযায়ী পণ্যের ওজনের হিসাব আরো বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে এ ব্যাপারে নতুন একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। সে অনুযায়ী, ৬ ও ১০ চাকার গাড়িভেদে কমলা, কেনু ও মাল্টা আমদানিতে যথাক্রমে ১৬ ও ২০ টন, আঙ্গুর আমদানিতে ১৭ ও ২০ টন, বেদানা ও আপেল আমদানিতে ১৭ ও ২৪ টন এবং আম আমদানিতে ২০ ও ২৪ টন পণ্য হিসাব করে শুল্কায়ন করা হচ্ছে।
শুধু ফলই নয়, বর্তমানে আরো কয়েকটি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্কহার নির্ধারণের নিয়ম চালু রয়েছে হিলি স্থলবন্দরে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুকনো মরিচ, হলুদ, আদা, রসুন, হিমায়িতমাছ, শুঁটকি মাছ, টমেটো ও পান আমদানির ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি চালু করা হয়। ফলে আট মাস ধরে এসব পণ্যের আমদানিও কার্যত বন্ধ রয়েছে।
চাকাভিত্তিক শুল্কায়নের নিয়মটি চালু করা হয় শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধের জন্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এ নিয়মের কারণে উল্টো রাজস্ব হারাতে হচ্ছে। সাড়ে চার বছর ফল ও আট মাস ধরে আরো কয়েকটি পণ্যের আমদানি বন্ধ থাকায় শুল্ক বাবদ কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
মাঝে মধ্যে বন্দর দিয়ে দু-একটি ট্রাকে করে এসব পণ্য আমদানি হচ্ছে বটে, তবে আগের তুলনায় পরিমাণটি একেবারেই নগণ্য। বাংলাহিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, আগে বন্দরটি দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৩৫-৪০ ট্রাক কমলা, আপেল, কেনু, আঙ্গুর, বেদানাসহ বিভিন্ন ধরনের ফল আমদানি হতো।
হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক গ্রুপের সভাপতি মো. হারুন-উর-রশিদ জানান, আগে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে গড়ে প্রতিদিন ৩৫-৪০ ট্রাক ফল আমদানি হতো। কিন্তু সোনা মসজিদ স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকির ঘটনার পর ফল আমদানির ক্ষেত্রে গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্কায়নের পদ্ধতি চালু করা হয়। ফলে একজন আমদানিকারক একটি ছয় চাকার গাড়িতে পাঁচ টন ফল আমদানি করলেও নির্দেশনা অনুযায়ী ১৪ টন পণ্যের শুল্ক দিতে হচ্ছে তাকে। এতে করে আমদানিকারকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে তারা চার বছর ধরে ফল আমদানি বন্ধ রেখেছেন। এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুকনো মরিচ, হলুদ, আদা, রসুন, হিমায়িতমাছ, শুঁটকিমাছ, টমেটো ও পান আমদানির ক্ষেত্রেও গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্ক আহরণের পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। লোকসানের ভয়ে এসব পণ্যের আমদানিও বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা।
তিনি দাবি করেন, দেশের অন্যান্য স্থলবন্দরে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ঘটলেও হিলিতে এমনটি কখনো হয় নি। এ কারণে রাজস্ব আহরণের স্বার্থে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ফলসহ অন্যান্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্কায়নের পদ্ধতি শিথিল করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
হিলি স্থল শুল্কস্টেশনের সহকারী কমিশনার মো. মশিয়ার রহমান বলেন, বন্দর দিয়ে ফলসহ অন্যান্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এনবিআর কর্তৃক গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্কায়নের যে নির্দেশনা রয়েছে, আমরা সে অনুযায়ীই শুল্কায়ন করে পণ্য ছাড়করণ করছি।

LEAVE A REPLY